মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

প্রখ্যাত ব্যত্কিত্ব

চলনবিল পাড়ের প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী উপজেলা পাবনার চাটমোহর। নানা ঐতিহ্য সাহিত্য আর সাংস্কৃতিক সম্ভারে পরিপূর্ণ একটি উপজেলা। যেখানে বীজ বপন করলেই সংস্কৃতির উর্বর জমিন হয়ে ওঠে লকলকে তরতাজা।এরই ধারবাহিতাকতায় উপজেলার তরুণরা নাটক, সঙ্গীত, কবিতা, পালাগানসহ সংস্কৃতির প্রতিটি ধারা চলমান রেখেছে। বলা হয় চলনবিল এলাকা সাহিত্য এবং সস্কৃতির এক বেলাভূমি। এখানে সংস্কৃতির বীজবপন করলেই স্বপ্নীল ফসল ফলে। চাটমোহরে সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাস অতি প্রাচীন। কর্মকান্ড সূচনার দিনক্ষণ জানা না গেলেও ধারণা করা হয় ব্রিটিশ আমল থেকে এ উপজেলায় সাহিত্য সংস্কৃতি গোরাপত্তন হয়। সে-সময় উপজেলায় হিন্দুধর্মালম্বীদের বসবাস ছিল অনেক। মাসে মাসে আয়োজন হতো যাত্রাপালা,পুথিপাঠ, ফকিরান্তি,মনসামঙ্গল পালা। বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক ভাড়া করে চলতো মাসের পর মাস যাত্রাপালা। গ্রামগঞ্জে বসতো পুথিপাঠের আসর। ষাটের দশকে চাটমোহর নতুনবাজার এবং পুরাতন বাজারের দুটি মঞ্চে বিভিন্ন সময়ে যাত্রাপালা প্রদর্শন হতো। বলা হতো সংস্কৃতির মেলবন্ধন এই চাটমোহর উপজেলা। সত্তর দশরকের পর এই এলাকায় সংস্কৃতি কর্মকান্ডের কিছুটা ভাটা পড়ে। আশির দশকে একদল তরুন যুবসমাজ আবার এগিয়ে আসে নিজেদের সাহিত্য সংস্কৃতি বাচানোর জন্য। গঠন হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। এর মধ্যে চাটমোহর সাংস্কৃতিক পরিষদ,মুক্তনাটক দল,সাংস্কৃতিক জোট গঠন করে শুরু হয় নতুন উদ্যমে সাহিত্য সাংস্কৃতিক চর্চা। তখন প্রতি সপ্তাহে উপজেলার কোন না কোন এলাকায় নাটকের প্রদর্শণী,কবিতা পাঠের আসর,গণসঙ্গীতের আসর বসতো। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গঠন করা হয় মুক্তনাটক দলের শাখা। বছরের একটা সময়ে করা হতো নাট্য উৎসব। উৎসবগুলোতে হাজির থাকতেন দেশ বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব, কবি, সাংবাদিক, গবেষক, নাট্যকার, সাহিত্যিক। এক সময় বলা হতো চাটমোহর নাটকের গ্রাম। নববই দশকের শেষের দিকে আবারও ভাটা পড়ে সাহিত্য সংস্কৃতির কর্মকান্ড। তৈরী হয় নতুন নতুন নাট্য এবং সাস্কৃতিক সংগঠন। এর মধ্যে তূর্য্য নাট্যম, সমন্বয় থিয়েটার, রিদম (সাংস্কৃতিক সংগঠন), চাটমোহর সাংস্কৃতিক একাডেমী, সৌখিন শিল্পী গোষ্ঠী, নির্ঝর সাংস্কৃতিক সংসদ, কর্ষণ কবিতা সংসদ, পরান চাষ অন্যতম। তবে বর্তমানে চাটমোহরে তূর্য্য নাট্যম, সমন্বয় থিয়েটার. রিদম, চাটমোহর একাডেমী, তাদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। মাঝে মধ্যে তূর্য্য নাট্যম দর্শনীর বিনিময়ে মঞ্চনাটক প্রদর্শন করে। সমন্বয় থিয়েটার বিভিন্ন সময়ে পথনাটকের প্রদর্শণী, নাট্য উৎসব, ভ্রাম্যমান নাট্য প্রদর্শণী, নাট্য সফর চালিয়ে যাচ্ছে। চাটমোহরে সাহিত্যের জগতের ব্যপ্তিও অনেক বিভিন্ন সময়ে চাটমোহর থেকে অসংখ্য পত্র পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। নিম্নে কিছু পত্র পত্রিকার তালিকা তুলে ধরা হলো। সেই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে কিংবা ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য পত্রিকা আর বই। বিগত দিনগুলি থেকে ২০০৬ ইং সাল (সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত প্রকাশিত হওয়া বই, নাট্যপত্র, সাহিত্যপত্র, নাটক, সাপ্তাহিক পত্রিকা অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে এই তালিকায়। মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘সবুজপত্র’ (বৈশাখ ১৩২১-১৩৩৪) উপ মহাদেশের বিখ্যাত লেখক চাটমোহরের গৌরব প্রমথ চৌধুরী সম্পাদনা করেন। ১৮৭৩ সালে গুনাইগাছা থেকে সাপ্তাহিক ’জ্ঞান বিকাশনী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয় যার সম্পাদনা করেন ভৈরব নাথ সিদ্ধার্থ। ১৮৭৪ সালে হরিপুর থেকে প্রকাশিত হয় ’ক্যালকাটা উইকলি নোট’ সম্পাদনা করেন যোগেন্দ্র নাথ চৌধুরী। ১৯৬৭ সালে কাটেংগা পল্লী উন্নয়ন সমিতির মুখপত্র হিসেবে ’চলনবিল’ (বার্ষিকী) বদরুদ্দিন আহমদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়।  এ.কে.এম.মজিবর রহমানের ৪ টি নাটকের পুস্তক। ১৯৬৯ সালে ’শহরের বুকে’. ১৯৭৩ এপ্রিল ’মুক্ত আকাশ’.১৯৭৩ জুলাই ’মানুষ ও পৃথিবী’  এবং ১৯৭৩ অক্টোবর ’এ নহে কল্পনা’। চাটমোহর সাংস্কৃতিক পরিষদ এস. এম. হাবিবুর রহমান সম্পাদিত ১৯৮৭ সালে সাহিত্য বিষয়ক ’প্রতীক্ষা.’ ১৯৮৬ সালে আহ্সানুল আলম সম্পাদিত ’কলাপাতা’.১৯৮৮ সালে মনোয়ার হোসেন চৌধুরী সম্পাদিত ’সাহস’ ১৯৮৯ সালে স্বদেশ বন্ধু সরকার সম্পাদিত ’তীরন্দাজ’ চাটমোহর মুক্ত নাটক দল সাহিত্য বিষয়ক ছোট কাগজ নির্মিতি’র তিনটি সংখ্যা প্রকাশ করে। ১৯৯০ সালে স্বদেশ বন্ধু সরকার,১৯৯১ সালে বৃন্দাবন দাস এবং ১৯৯৩ সালে সাংবাদিক রকিবুর রহমান টুকুন ’নির্মিতি’ সম্পাদনা করেন। ১৯৯৭ সালে চাটমোহর মুক্ত নাটক দল নাটক বিষয়ক কাগজ ’নাট্যপত্র’ প্রকাশ করে। নাট্যপত্র সম্পাদনা করেন সাংবাদিক রকিবুর রহমান টুকুন। ১৯৯৩ সাল থেকে এস.এম.হাবিবুর রহমান সম্পাদিত সাপ্তাহিক ’চাটমোহর বার্তা’ অনিয়মিত ভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বিজয় দিবস উপলক্ষে ’রক্তাক্ত মানচিত্র’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন এ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন সাখো। ১৯৯৮ সালে রশীদ নিউটনের কবিতার বই’নির্ঘুম রাতের বিলাপ’ প্রকাশিত হয়। হেলালুর রহমান জুয়েল সম্পাদিত ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ’সুচনা’ ৬টি সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে ২ সংখ্যা, ১৯৯৮ সালে ১ সংখ্যা, ১৯৯৯ সালে ২ সংখ্যা এবং ২০০১ সালে ১ সংখ্যা। ২০০২ সালে সমন্বয় থিয়েটার ’নাটক নামা’ নামে রেজাউল করিম সম্পাদিত একটি নাটকের কাগজ বের করে। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ’বিলকুড়ালিয়া বুলেটিন’ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনা করেন আতাউর রহমান রানা মাষ্টার। ২০০০ সাল হইতে চলতি বছর পর্যন্ত চাটমোহরের বিশিষ্ট নাট্যকার আসাদুজ্জামান দুলাল রচিত ও সম্পাদিত ১৪ টি নাটকের বই প্রকাশিত হয়। যার মধ্যে রয়েছে ’তিনটি নাটক’, ’ছয়টি নাটক,’ ’দুইটি নাটক’, ’লংকা কান্ড ও অন্যান্য নাটক’, ’ভাগফল’, ’স্বপ্নভাসা কাব্য’, ’বাথান’, ’শুকচান্দের মোড়’,’চাঁদের হাট’,’পানশী বিলাস’,’নহ নর্তকী’, ’বিচার সভা’, ’ভূতের পাঁচ পা’ এবং ’আরও দুইটি নাটক’। ১৯৮২ সালে মতি স্মৃতি সংসদ থেকে ’মতি তা’র সাহিত্য’ নামে রেজাউল করিম মতি’র ২১ টি কবিতা ১ টি ছোট গল্পের পুস্তিকা সম্পাদনা করেন জাকির হোসেন। বাংলা ১৪০০ সালে ’শ্রী শ্রী চড়ক পূজা’ রচনা ও সম্পাদনা করেন তারাপদ বিশ্বাস। ২০০২ ইং সালে আব্দুল মতিন স্মরণে ’তটরেখা’ সম্পাদনা করেন মনোয়ার হোসেন চৌধুরী। ২০০৩ সালে সাহিত্য বিষয়ক পত্রিকা ’প্রজন্ম চাটমোহর’ নামে একটি বই সম্পাদনা করেন মামুনুর রশীদ মামুন। ২০০৫ সালে পরান চাষ সাংস্কৃতিক সংগঠন ’পরান চাষ’ নামে একটি পুস্তক প্রকাশ করে মাহবুব হাসান লিটু সম্পাদিত। ২০০৬ সালের কবিতা পত্র মাসিক ’বিজয়ী’ অনিয়মিত ভাবে সম্পাদনা করছেন আব্দুল মমিন। এছাড়া ২০০৮ সালে চাটমোহর থেকে এক যোগে দুইটি সাপ্তাহিক এবং একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। সাপ্তাহিক ছন্দা সম্পাদনা করছেন হেলালুর রহমান জুয়েল (২০১২ সালের প্রথম দিকে পত্রিকাটির চাটমোহর থেকে প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়)। সাপ্তাহিক সময় অসময় সম্পপাদনা করছেন কেএম বেলাল হোসেন স্বপন এবং দৈনিক চলনবিল সম্পাদনা করছেন সাহিত্যিক, আবৃত্তিকার, কন্ঠশিল্পী, অভিনেতা, সংগঠক, রকিবুর রহমান টুকুন। ২০১১ সালে  সাপ্তাহিক সবুজ আলো পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয়। পত্রিকাটি সিদ্দিক আলম সবুজ সম্পাদনা করছেন। এছাড়া হান্ডিয়াল থেকে সাপ্তাহিক চলনবিলের আলো নামে পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন মোঃ রফিকুল ইসলাম রনি। বর্তমানে দৈনিক চলনবিল পত্রিকা ছাড়া বাকি ৪টি পত্রিকা অনিয়মিতভাবে প্রকাশ হচ্ছে। জানা যায়, দৈনিক চলনবিল, চলনবিল অঞ্চলের প্রথম এবং একমাত্র দৈনিক পত্রিকা।